ফেরা হলো না | শাহরিয়ার কাসেম

0
118
গ্রামের নাম শান্তিনগর। শহুর থেকে বেশ দূরে এই গ্রাম। রাস্তাঘাট নেই, বিদ্যুৎ নেই। বড় বড় বিল্ডিংও নেই। তবে গ্রামের ভিতরে বয়ে গেছে অাঁকা বাঁকা মেটোপথ। গ্রামের একপাশে নদী। নদীতে মাছ ধরছে জেলেরা। নদীর ঘাটে অবাদে সাঁতারে ব্যস্ত এক বয়সী দুষ্টু ছেলের দল। গ্রামের চারপাশে সবুজের সমারোহ। শান্তিনগরে শান্তির অভাব নেই। হিন্দু- মুসলিমের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। কোথায় কোন হিংসা নেই, বিভেদ নেই। রাত শুরু হয় সনাতনী কীর্তনে অার ভোর হয় ‘অাস্সালাতু খাইরুম মিনান্নাউম’ মুয়াজ্জিনের মধুর অাযানে। এভাবেই চলে যাচ্ছে দিন- রাত শান্তিনগরে শান্তির অাহবানে। শান্তিনগরের পঁচিশ বছর বয়সী এক যুবক গোলাম রসূল। গোলাম রসূলের গোলগাল চেহেরা, সুঠাম দেহ, বাঁবরী চুল, মায়াকাড়া চাহনী। শিক্ষাদীক্ষা বলতে নেই তাঁর। কারণ এ গ্রামে তথা অাশেপাশে নেই কোন স্কুল, কলেজ। ধনাঢ্যরা শহুরে বা বিলেতে গিয়ে পড়ছে। তবে যারাই উন্নত জিবনের লক্ষ্যে গ্রাম ছেড়েছে তাঁরা কেউই অার গ্রামে ফিরে অাসেনি। তাই হয়ত এই গ্রামে সভ্যতার অালো পৌঁছুইনি। লেখাপড়া নিয়ে কোন অাক্ষেপ নেই গোলাম রসূলের। সরাদিন ক্ষেতে খামারে কাজ করে নিজ ঘরে দিব্যি কাটিয়ে দিচ্ছে দিনের পর দিন। গোলাম রসূল নিরক্ষর হলেও বিবেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ। অন্তত গোলাম রসূলের দ্বারা কোন অনৈতিক কাজ হবেনা সেটা শান্তিনগরের সবারই জানা। এজন্য গ্রামের সবাই অালাদা নজরে দেখে গোলাম রসূলকে। গোলাম রসূলের নিজের কোন জমি- জামা নেই। সারাদিনের পারিশ্রমের সামান্য টাকারর জন্য অন্যের জমিতে কাজ করে প্রতিদিন। বাবা- মা নেই তাঁর। একছালা একটি ঘর ছাড়া অার কিছু নেই। গোলাম রসূল যখন খুব ছোট তখন বাবা- মা ওলাউঠা হয়ে মারা যায়। সে বছর নাকি গ্রামের অর্ধেকেও বেশী লোক মারা গিয়েছিল। সে সময় গোলাম রসূলের এক দূর সম্পর্কের খালা পাশের গ্রামে নিয়ে যায়। সেখানে পনের বছর পর্যন্ত থেকেছিল। পরে বাবার ভিটায় এসে কোন রকম দিনাতিপাত করছে। কুলসুম হল ময়না ব্যাপারীর এক মাত্র মেয়ে। ময়না ব্যাপারী শান্তিনগরের বড় মাতব্বর। পাকিস্তানী শাসকদের সাথে হাতে হাত মিলিয়ে চলে। তাই গ্রামের খাজনা সহ খাস জমি নিজের দখল, নিরীহদের সম্পদ লুটের সব কাজ তিনি করে থাকেন। শাসকদের দালাল বললেও ভুল হবেনা। গ্রামের প্রায় অর্ধেক লোক ময়না ব্যাপারীর কথায় উঠে অার বসে। চোঁখে চোঁখ রেখে তাঁর সাথে বলার সাহস এখনো কারো হয়ে উঠেনি। তিনি যেহেতু গ্রামের মাথাওয়ালা তাই অবাদে সবাই ময়না নাম মুখে নেয়না। কারণ বেয়াদবি হওয়া ডরে। সবাই ব্যাপারী সাহেব বলেই ডাকে। অনেকে অাঁড়ালে ব্যাপারীকে অনেক কিছু বলে গালমন্দ করলেও সামনে নতমস্তকে জি ব্যাপারী, জি ব্যাপারী বলে ধর্না দেয়। একবার ব্যাপারী সাহেবের মেয়ে কুলসুম নদীতে গোসল করতে গিয়েছিল। গ্রামের মেয়ে হলেও কুলসুম সাঁতার জানতনা। নদীর মাঝারি স্রোত থাকায় কখন যে তলিয়ে যাওয়ার অবস্হা হল বুঝতেই পারিনি কুলসুম। হাবুডুবু খাচ্ছে কুলসুম। অাশেপাশে কেউ নেই। তবে একটু অদূরে জমিতে কাজ করছে গোলাস রসূল। কুলসুমের অাঁধা অাঁধা স্বর গোলাম রসূলের কানে পৌঁছল। দৌড়ে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে জিবন উদ্ধার করে কুলসুমের। এরপর থেকে ব্যাপারী সাহেব বেশ অাহ্লাদি দেখায় গোলাম রসূলকে। কিন্তু শাসকদের পা- চাটা গোলামকে মনে প্রাণে সহ্য করতে পারতনা গোলাম রসূল এমনকি গ্রামবাসিও। সেবার থেকেই কুলসুমকে ভাল লেগে যায় গোলাম রসূলের। চাইলেই কি সব পাওয়া যায়। হয়ত না। কিছু না পাওয়া থেকেই যায় জিবনে। গোলাম রসূলের অারো শত ভাবনা মনে মনে। একটা শাসকদের চামচার মেয়ের সাথে অামি প্রেম করব? দালাল হবে অামার শশুর? না না এ কিছুতেই সম্ভব নয়। অারো কত ভাবছে গোলাম রসূল। কিন্তু শত ভাবনার গভীরে কুলসুমের জন্য কেন এত মায়া কেন এত ভালবাসা। বুঝে অাসছেনা গোলাম রসূলের। নদী থেকে পাড়ে তোলে অানার পর মায়াবিনী হরিণীর চোঁখ দিয়ে গোলাম রসূলের দিকে যখন কুলসুম তাকিয়েছিল তখন নির্ঘাত গোলাম রসূল খুন হয়েছিল। এরপর থেকে প্রায়ই গোলাম রসূল কুলসুমকে দেখার জন্য ব্যাপারী সাহেবের বাড়ি যেত। কিন্তু ব্যাপারী সাহেব কিছু বলতনা। কুলসুমকে এক নজর দেখেই অাবার চলে অাসত গোলাম রসূল। গোলাম রসূলের দিকে অপলক নয়নেও চেয়ে থাকত কুলসুম। কিন্তু কেউ কোন কথা বলতনা। শুধু বিদায়ের সময় দু’জন দু’জনার দিকে তাকিয়ে এক গাল হাসত। এ লাজুক হাসিটাই প্রেমের পূর্ব লক্ষণ। যা কেউই বুঝার অপেক্ষা রাখেনি। একদিন সাহস করে তাঁর প্রেমের কথা বলেই ফেলল গোলাম রসূল কুলসুমকে। হয়ত এটুকুর জন্যই অপেক্ষা করছিল দিনের পর রাত কুলসুমও। সহসায় একে অপরের ভালবাসার কথা বলে দেয়। যেন গোলাম রসূল অার কুলসুমের প্রেমের লগন চলছে। তাঁরা প্রায়ই দেখা করত নিরবে নির্জনে। এখন প্রতিদিন একে অপরকে না দেখলে প্রাণ বাঁচেনা। যে করেই হোক দেখা করতেই হয়।
জোৎস্না রাত। খোলা অাকাশের নিচে গোলাম রসূলের বুকে মাথা রেখে কথা বলছে কুলসুম। যেন প্রেমময় পৃথিবী। প্রেমের ফাগুন অাওরাচ্ছে শান্তিনগরের অানাচ- কানাচে। কুলসুম একপ্রহর থেকে চুপিচুপি অাবার ঘরে ফিরে। কুলসুমের প্রেমের মোহে পড়ে অারো দেওলিয়া গোলাম রসূল। কুলসুমকে প্রতি মুহূর্তে পেতে চায় গোলাম রসূল। এ স্বপ্ন নিয়ে প্রতি রাত ঘুমাতে যায় গোলাম রসূল। প্রতিদিনের মত পাখির কিচিরমিচির শব্দে ঘুম ভাঙল গোলাম রসূলের। তবে অন্যান্য সকালের মত অাজকের সকালটা মনে হচ্ছেনা গোলাম রসূলের। গ্রামের মানুষ গুলো যেন অারো অাগেই ঘুম থেকে জেগেছে। কিন্তু সবাই একে অপরের কাছে কি যেন ফিসফিস করে বলছে। কিন্তু গোলাম রসূল যেন এ বিষের কিছুই জানেনা। কৌতূহল নিয়ে রমজানের বাপের কাছে গিয়ে বলল রহমত কাকা কি হইছে? ক্যানো তুমি কিছু জানোনা দেহি? না কাকা। কিছু জানিনা তো। কি হইছে কন? শুনো মিয়া__ দেশ স্বাধীন হইতে চাইছে। সারা দেশে এখন মুক্তিযুদ্ধ চলছে। পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীর সাথে অামাগো যুদ্ধ করোন লাগব। ঢাকাতে নাহি যুদ্ধ শুরু হইয়া গ্যাছে। অামাগোও যুদ্ধের জন্য রেডি হইতে হইব। এই দেশকে স্বাধীন করতে হইব। রহমত কাকার জ্বালাময়ী কথা গুলো শুনে গোলাম রসূলের শরীরের লোম গুলো তৎক্ষণাত দাঁড়িয়ে গেল। এবং রহমত কাকাকে বলল, কাকা _ অামাগো তো কোন ধরণের অস্র নেই। অামরা ক্যামনে যুদ্ধ করুম। অারে মিয়া _ তাড়াতাড়ি ঢাকা যাইয়্যা মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং ক্যাম্পে যোগ দেও। যাওয়া অাগে অালী নেওয়াজের থেইক্যা ঠিকানা লইয়্যা যাইও। তারাই ট্রেনিংয়ের পর অস্র দেবে। গোলাম রসূল দেশ স্বাধীনের জন্য মরিয়া হয়ে উঠল। হাতে অস্র নিতে চায়। দেশকে রক্ষা করতে চায়। অধীকার অাদায় করতে চায় গোলাম রসূল। গোলাম রসূল কালই ট্রেনিংয়ের জন্য ঢাকায় যাবে। তবে তার অাগে কুলসুলমের সাথে সাক্ষাত করা জরুরী। অাজ রাতে কুলমের সাথে দেখা করল। অাজও জোস্না রাত। খোলা অাকাশের নীচে গোলাম রসূলের বুকে মাথা পেতে তারা গুনছে কুলসুম। কিন্তু অন্যান্য সময়ের মত অাজকের দেখাতে রোমান্স নেই। অাজ শুধু গোলাম রসূলের যুদ্ধে যাবার কথা। ফিরে এসে প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাখার কথা। তবুও গোলাম রসূলের মুখ দিয়ে বারুদের মত বের হচ্ছে… কুলসুম তুমি কোন চিন্তা কইরোনা। অামি দেশ স্বাধীন কইরা অাবার গ্রামে ফিরা অাহুম। অামরা যদি হাতে অস্র না নিই দেশের জন্য যুদ্ধ করব কে? অামাদের অধীকার অামরা অাদায় কইরাই ছাড়ুম। কুলসুম তুমি মাত্র কয়টা দিন ধৈর্য্য ধইরা থাকো। যুদ্ধের পরেই অামরা বিয়া করুম। গোলাম রসূলের বীর কন্ঠে এ কথালো কুলসুমকে কতটা শান্তনা দিচ্ছে তা মুখে প্রকাশ করতে পারছেনা কুলসুম। শুধু চোঁখের পানি দিয়ে ভিঁজছে গাল ও বুক। কুলসুমও ফিরে এসে বিয়ের অাশায় সহসায় জড়িয়ে ধরল। ফিরে না অাসা অবদি অপেক্ষায় থাকবে কুলসুম। এক সাথে বেঁচার অাশায় খানিক দেখা শেষ করে বাড়িতে অাসল গোলাম রসূল। সকালেই ঢাকাতে পাড়ি জমায় গোলাম রসূল। ট্রেনিং ক্যাম্পে যোগ দিল। ট্রেনিং শেষে অস্র হাতে দেশের জন্য শুরু করল যুদ্ধ। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হল। ত্রিশ লাখ বাঙালী নিহত হল। অাড়াই লাখ মা বোনের ইজ্জ্বত হারাল। স্বাধীনতার পতাকা বাঙলার মুক্ত অাকাশে উড়ল। যুদ্ধ শেষে অাহত বাঙলার সৈনিকরা বীর বেশ ঘরে ফিরল। হয়ত হানাদারের বুলেটে জাজরা হয়ে গেছে গোলাম রসূলের কুলসুমের মাথা রাখা বুক। অনেকেই ঘরে ফিরলেও অার ফেরা হবেনা, নতুন করে ঘর বাঁধাও হবেনা শান্তিনগরের এক যুবক গোলাম রসূলের। শত অপেক্ষা কুলসুমের। গোলাম রসূল অাসবে। সারাক্ষণ দোয়ারে বসে বসে কার অাগমনের প্রহর গুনে। রাত যায় দিন কাটে কিন্তু গোলাম রসূল অাসছেনা। কথা দিয়েছে কুলসুম অপেক্ষায় থাকবে সে না অাসা পর্যন্ত। এবং কথা দিয়েছিল গোলাম রসূলও ফিরে বিয়ে করবে। কিন্তু গোলাম রসূল তবুও অাসছেনা। এ ভাবে অনেক দিন যাবার পর কুলসুম ভাবছে গোলাম রসূল কি কথা দিয়ে কথা রাখেনি। নাকি গোলাম রসূলের অার ফেরা হবে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here