ইতিহাস পাঠে প্রযুক্তিই বন্ধু

0
110

ক’দিন আগে ফেসবুকের নিউজফিডে একটা ভিডিও চোখে পড়লো, বর্তমান প্রজন্মের কয়েকজনের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে অপারেশন সার্চলাইট কী? শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক কে ছিলেন? ১৪ ডিসেম্বর আমরা কী দিবস হিসাবে পালন করি, কেন করি? -এমন বেশ কয়েকটি ইতিহাসবিষয়ক প্রশ্ন। 

উত্তরদাতাদের উত্তরগুলো আশার চোখে বালি দিল। ইতিহাস একটা জাতির অগ্রগতির সবচেয়ে বড় শক্তি।  জানার ও জানানোর, নিজেদের উপস্থাপনের অনন্য উপাদান ইতিহাসেই রয়েছে। কিন্তু আমাদের তরুণ প্রজন্ম, আগামী প্রজন্মের কাছে ইতিহাস অনেকটা অনাগ্রহের মধ্যে, দিবসভিত্তিক উদযাপনে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।  উদযাপিত দিবসটির তাৎপর্য বা এর পেছনের ঘটনা বহুজনেরই অজানা।

আমাদের ভবিষ্যত অগ্রগতি নির্ভর করছে ডিজিটাল অনুষঙ্গের ওপর। সেসব অনুষঙ্গকেই আমরা কাজে লাগিয়ে ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে পারি সহজে।

আসছে ১৬ ডিসেম্বর, মহান বিজয় দিবস। মাস জুড়ে শুরু হয়েছে নানা আয়োজন। রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো বকতৃতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রদর্শনী ইত্যাদি নানা আঙ্গিকের নানা আয়োজন করে চলছে। গণমাধ্যমগুলোতে রয়েছে আলাদা আয়োজন। এ আয়োজনের আবশ্যতা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। এমন উদযাপন আমাদের ইতিহাসকে জানার, ঐতিহ্যকে লালনের এবং বিশ্বাস ও মূল্যবোধকে ধারণে সহায়ক। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে, এই আনুষ্ঠানিকতা থেকে আমরা কী শিখছি, নাকি নিছকই উদযাপন করছি বিশেষ দিবস?

নিছক উদযাপন আমাদের তারুণ্যদীপ্ত উজ্জ্বল ইতিহাসকে মলিন করবে। তাই সে মলিনতার হাত থেকে আমাদের অহঙ্কারকে মুক্ত করতে এগিয়ে যেতে, প্রকৃত ইতিহাস নিজে জানতে, অন্যকে জানাতে এবং ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে ডিজিটাল প্রযুক্তি একটা বড় হাতিয়ার হতে পারে।

ইতোমধ্যে ই-লার্নিংয়ের যুগে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড প্রণীত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবই এখন তাদের ওয়েবসাইটে রয়েছে, যেখান থেকে শিক্ষার্থীরা সহজেই যেকোনো স্থান থেকে যেকোনো সময় নিজের সুবিধামতো পাঠগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন। টেন মিনিট স্কুলের মত এডুকেশন প্লাটফর্মের বেশ আলোচিত । এ প্লাটফর্মের মাধ্যমে তারা প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য ডিজিটাল ক্লাসের আয়োজন করছে। ফলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা মানসম্পন্ন পাঠগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন। ডিজিটাল যুগের সৌন্দর্য্যটা এখানেই। দেশ, কালের ব্যাপ্তি ছাড়িয়ে ডিজিটাল প্রযুক্তি আমাদের সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে। দেশে বসেই আমরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করা থেকে শুরু করে দূর-শিক্ষণের মাধ্যমে সনদ পর্যন্ত অর্জন করতে পারছি।

ঠিক এই প্রেক্ষাপটকেই আমরা কাজে লাগাতে পারি ইতিহাস শিক্ষণে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইউটিউব, ব্লগ, গণমাধ্যমের অনলাইন সংস্করণ, অ্যাপ বা পরিকল্পিত ওয়েবসাইটের মাধ্যমে প্রকৃত ও বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস তুলে ধরা যেতে পারে। তবে তা যেন শুধু তথ্যের সমারোহ না হয়। প্রয়োজন উদ্ভাবনী উপস্থাপন, দৃশ্যায়ন ও বর্ণনায় পাঠক বা দর্শককে ধরে রাখার প্রচেষ্টা। যেন সহজ, বোধগম্য ও প্রাঞ্জল ভাষায় আকর্ষণীয় উপায়ে তা নতুন প্রজন্ম ও দেশবসীর সামনে উপস্থাপন করা হয়। এক্ষেত্রে শুধু সরকারি উদ্যোগ নয়, বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতাও কার্যকর হতে পারে।

যেমন সকল স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য ইতিহাসের আলাদা আলাদা ঘটনাপঞ্জির ওপর ভিডিও-ভিত্তিক বা দৃশ্যায়ন-ভিত্তিক অ্যাপ চালুর সুযোগ আছে আমাদের। পাঠ্যপুস্তক বহির্ভূত এসব শিক্ষা শিক্ষার্থীর চেতনা ও মূল্যবোধকে জাগ্রত করতে সহায়ক হবে। এ শিক্ষণ শুধু ইতিহাস নয়, জীবনের পথচলায় নিত্যদিনের প্রয়োজনে যে জ্ঞান আমাদের কাজে লাগে, তার যেকোনটির ওপরই হতে পারে। হতে পারে গণিত, বাংলা, ভূগোল, সাধারণ বিজ্ঞানের মতো বিষয়গুলোতেও। এ প্রক্রিয়া শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত জাতি নয়, প্রকৃত শিক্ষা ও চেতনাসমৃদ্ধ জাতি উপহার দিতে পারে আমাদের। শুধু শিক্ষার্থীদের কথাই কেন, যেকোনো বয়সের, যেকোনো আর্থ-সামাজিক অবস্থানের ব্যক্তির জ্ঞানের পিপাসা মেটাতে ডিজিটাল প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে পারি আমরা।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচন, ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্র আন্দোলন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মতো সমকালীন ইতিহাসের পাশাপাশি আমরা যেন জানি, ১৭৫৭, ১৮৫৭, ১৯০৫, ১৯১১-এর মতো সালগুলো ঘিরে আমাদের ইতিহাসের গৌরবময় ঘটনা।

গেরিলা রুমিদের পাশাপাশি আমাদের মানসপটে যেন আঁকা থাকে বাদল, বিনোদ, দিনেশের নামও; যেন ভুলে না যাই তিতুমীর, ক্ষুদিরাম, মাস্টারদা সূর্যসেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের আত্মত্যাগের কথা। কারণ, আংশিক বা শুধু সাম্প্রতিক ইতিহাস কখনো সত্যকে প্রতিফলিত করে না, আর প্রকৃত সত্য প্রতিফলিত না হলে প্রকৃত শিক্ষা লাভের আশায় গুঁড়ে বালি।

তাই ডিজিটাল বাংলাদেশে ডিজিটাল প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে আমরা শিখতে চাই প্রকৃত ইতিহাস, সে ভিডিওচিত্রের উত্তরদাতার মতো যেন কখনো যেন বলতে না হয়, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক একজন কবি ছিলেন! আমরা চাই তরুণ প্রজন্ম যেন প্রকৃত ইতিহাস জেনে জাতিকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here